শ্রীরামকৃষ্ণে র শৈশব ও বাল্যলীলা
লেখকঃ শ্রী তন্ময় পন্ডিত
ধন্য এই অন্ত্যপাতী গ্রাম কামারপুকুর। এই গ্রামের প্রকৃ তি প্রাণভরে’ প্রত্যক্ষ করেছে দেবশিশু গদাধরের লীলা। এই সাধারন গ্রাম অবতারের ক্রীড়াভূ মি রূপে আজ জগদ্বিখ্যাত। সময় অতিবাহিত হয় । একটু একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে চণ্দ্রমনির আদরের গদাই। যেমন মা তেমনি তার ছেলে যেন যশোদার কোলে গোপাল। একদিন হঠাত চণ্দ্রা অবাক হয়ে দেখলেন গদাধরের শয্যায় শায়িত এক প্রকান্ড দিব্য পুরুষ। ভীত সন্ত্রস্ত জননী আশ্বস্ত হলেন যখন সেই পুরুষ আবার গদাধরে পরিনত হল। ঘটনাটি যেন মনে করিয়ে দেয় শিশু কৃ ষ্ণের সেই মাটি খাওয়ার কথা। যেইনা যশোদার ধমক খেয়ে মুখ খুলেছে গোপাল ছেলের মুখে মা দেখলেন ঘূর্ণায়মান গ্রহ নক্ষত্র বিশ্ব ব্রক্ষান্ড। তবে যশোদার মত চণ্দ্রমনিরও এসব কথা মনে থাকবেনা। মায়ার প্রভাবে মায়েরাও বিমোহিত। কিন্ত সময়ের সঙ্গে এ শিশুর দৈবভাব প্রকটিত হতে থাকল আরো বেশি করে। সে মাঝে মাঝে বাড়ির উঠোনে বিভিন্ন দেবদেবীর উপস্থিতি টের পেত। কখনও দেখতে পেত হাঁসে চড়া ঠাকুর। পাড়ার লোকজনের কাছে গদাধরের আলাদা আদর। এখন থেকে মহিলার দল চণ্দ্রার দুয়ারে মেলা বসিয়ে দিত। সবাই গদাইকে একবার কোলে নিতে চায়। দিনের শেষে একবার ছু টে আসে এই দেবশিশুর আকর্ষণে। প্রান জুড়িয়ে নেয় তার দিব্য দর্শনে। গ্রাম্য প্রকৃ তির অনাবিল স্পর্শে পরিপুষ্ট হয়ে বেড়ে উঠতে থাল সকলের নয়নের মনি। একটু বড় হতেই তার মধুর বাক্যে মুগ্ধ হতে থাকে গ্রামবাসী। ধাত্রীমা ধনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক । ধনীর অনুরোধে সে তাকে উপনয়নের সময় ভিক্ষামাতা করার প্রতিশ্রুতি দিল। বালক গদাধরের আরেক অসমবয়সী বন্ধু ছিল চিনু শাঁখারি। পরস্পরের সঙ্গে দেখা হলেই জমে যেত আলাপচারিতা। চিনু গদাইকে নাড়ু খেতে দিত এবং তাকে খুব আদর করত। এই চিনু শাঁখারিই তাকে একবার অবতার জ্ঞানে পূজো করেছিল। পরবর্তী কালে যিনি সারা জগতের পূজা পাবেন সেই অবতার পুরুষের পূজা শুরু হয়েছিল এক নিরক্ষর সরল শাঁখারির হাতে। গদাইয়ের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু ও শেষ হয় লাহা বাবুদের পাঠশালায়। প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতি তার ভালো লাগেনি। তাই প্রথম থেকেই সে ছিল আজকের ভাষায় ড্রপ আউট ছাত্র। পাঠশালা পালিয়ে আত্মগোপন করত পাশের বিষ্ণু মন্দিরে। সেখানে বসে মাটির প্রতিমা গড়ে’ আপনমনে পূজো করা ছিল তার খুব প্রিয় কাজ। পাঠশালায় অঙ্ক বিষয়টি তার একেবারেই ভাল লাগত না। শুভঙ্করী অঙ্ক ধাঁধার মত মনে হত। তবুও তার পাঠশালায় যাতায়াত ছিল তখনও পর্যন্ত। কিন্ত গুরু মশায় যখন বিয়োগ শেখানো আরম্ভ করলেন তখন সে চিরতরে পাঠশালা যাওয়া বন্ধ করে দিল। ভবিষ্যতে যিনি মানুষকে সমন্বয় শেখাতে এসেছেন অসীমের ঘর থেকে তিনি পারলেন না কোন কিছু বাদ দেওয়া শিখতে। পাঠশালা না গেলেও গদাইয়ের বন্ধু সংখ্যা বাড়তে লাগল সময়ের সঙ্গে। বন্ধু মহলে সেই নেতা। আর তাদের বিচরন ক্ষেত্র প্রায় সারা গ্রাম। বিশেষত মানিক রাজার আম বাগানে যেন গোকুলের গোপাল ফিরে এলো। সঙ্গে গোপ বালকের দল। ধর্মদাস পুত্র গয়াবিষ্ণু তার সুদামা। এমনই হৃদ্যতা। এরকম সময়েই কোন একদিন গদাইয়ের চোখে পড়ল কয়েক খন্ড কালো মেঘের বুক চিরে উড়ে যাওয়া একদল সাদা বকের সারি। দৃশ্যটি দেখে প্রাণচঞ্চল বালক নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে’ মূর্চ্ছি ত হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। বন্ধুরা বাড়ি নিয়ে এলে তার সম্বিত ফিরল সহজেই। শরীর বা মনে রকম বিকৃ তির চিহ্ন দেখা গেলনা। শাস্ত্রজ্ঞানী পিতা হয়তো কিছু টা বুঝলেন গদাধরের এই আধ্যাত্মিক আবেশ। একেই হয়তো বলা হয় ভাব সমাধি যা লাভ করার জন্য কত মুনি ঋষি যুগ যুগান্ত তপস্যা করেন। আর সরল গ্রাম্য ছেলেটি কত সহজেই এই ভাব সমাধির অনুভূতি লাভ করল। এইতো শুরু। পরবর্তী জীবনে এরকম দুর্লভ অপরোক্ষ অনুভূতি তার কাছে ধরা দেবে নিয়মিত অভ্যাসের মত। আর বিস্ময়ে অভিভূ ত বিশ্ববাসী ভাববে কে এই মহা পুরুষ- মানুষ না নররূপী নারায়ন?
