রামকৃষ্ণদেবের আবির্ভাব
1836 খ্রীষ্টাব্দের এক মনোরম ফাল্গুন মাসের ভোরবেলা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হুগলী জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম কামারপুকুরে এক দরিদ্র ব্রাক্ষণ পরিবারের কুটিরে ভুমিষ্ঠ হয়েছিলেন। পিতা সত্সনিষ্ঠ ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় ও মাতা ভক্তিমতী চন্দ্রমনি দেবী। শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব সেসময় ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাই ভেবে দেখতে হবে তাঁর শুভাগমনর যুগ প্রয়োজনীয়তার দিকটি। গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- “ যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত
অভ্যুত্থান অধর্মস্য তদাত্মনং সৃজাম্যহম”। অর্থাত ধর্ম যখন গ্লানিতে পরিপূর্ণ হয় তখন সাধুদদের উদ্ধার ও দুষ্কৃতীদের বিনাশ করতে ভগবান বারে বারে জন্মলাভ করেন। শাস্ত্র প্রমানে দেখা যাচ্ছে রামকৃষ্ণদেব পূর্ণব্রক্ষ নারায়নের অবতার যাঁর আগমনের কারন ধর্মের সমন্বয় সাধন। তাঁর আবির্ভাবের প্রায় তিনশো বছর আগে বঙ্গভূমি প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্য দেবের লীলা প্রত্যক্ষ করেছিল। মাত্র তিনশো বছরের ব্যবধানে কি এমন ঘটল যে আরেকজন অবতারের আগমন হয়ে উঠল অবশ্যম্ভাবী। হ্যাঁ রামকৃষ্ণদেবের আবির্ভাবের সময় একের পর এক বৈদেশিক আক্রমনে ভারতবর্ষ পর্যুদস্ত। ক্রীশ্চান ও মুসলমান এই দুই চরমপন্থী ধর্মের দ্বিমুখী আক্রমণে সনাতন ধর্মের অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন। এদিকে সনাতন ধর্ম নিজেও একের পর এক সম্প্রদায়ের উথ্থানে হয়ে পড়েছিল বিভেদ বিদীর্ণ- একতার একান্ত অভাব। জাতি ক্রমশ পাশ্চাত্যের পরানুকরনে মগ্ন হয়ে দাসত্বে নিজের অতীত গৌরব বিস্মৃত। এমতাবস্থায় 1835 সালে ব্রিটিশ শাসক প্রণয়ন করল মেকলে মিনিটের শিক্ষা নীতি যার মূল লক্ষ্য ছিল কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে ভারতীয়দের সনাতন অস্মিতা একেবারে মুছে ফেলা। বলা হয়েছিল ইউরোপের যেকোন লাইব্রেরির এক তাক বইয়ের কাছে ভারতের সমগ্র সংস্কৃত সাহিত্য কিছুই নয়। আশ্চর্য হলেও সত্যি এই মিনিট প্রণয়নের ঠিক একবছর পর কামারপুকুরে এমন একজন মহাপুরুষ জন্মলাভ করলেন যিনি পাশ্চাত্যের পাঠশালায় একটি বর্ণও না শিখে দেশবাসী শেখাবেন তাদের মহান দেশের শাশ্বত গৌরব গাথা। ধর্মকে গ্লানি মুক্ত করতে তাঁর আবার শুভাগমন- ‘সম্ভবামি যুগে যুগে’।
শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের কিছুদিন আগে থেকেই তাঁর ন্যায়পরায়ন পিতা মাতা তাঁর আবির্ভাবের দৈব সঙ্কেত পেয়েছিলেন। ক্ষুদিরাম গয়াধামে তীর্থ করতে গিয়ে গদাধর বিষ্ণুর স্বপ্ন পেয়েছিলেন- স্বয়ং নারায়ন তাঁর পুত্র রূপে ধরকধামে আসতে অভিলাষী। কামারপুকুরেও জননী চণ্দ্রাদেবী যুগী শিব মন্দিরে সন্ধ্যা প্রদীপ দিতে গিয়ে এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকলেন। হঠাৎ শিবলিঙ্গ থেকে নির্গত দিব্যজ্যোতি তাঁর উদরে প্রবেশ করল। তিনি মুর্চ্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই অনুভব করলেন তাঁর গর্ভে এক দিব্য শিশুর উপস্থিতি। কিন্ত মায়ার প্রভাবে এসব ঘটনা তাঁদের আর মনে থাকল না। ফাল্গুন মাসের এক পূন্য ব্রাক্ষ মুহুর্তে সেই দিব্য শিশু ঢেঁকিশালের ঘরটিতে ভুমিষ্ঠ হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। ধাত্রী মাতা ধনী কামারনী নবজাতককে জানালেন এই পৃথিবীতে স্বাগতম। অন্তপাতী গ্রামের মানুষ বুঝতেই পারলনা নর শরীর ধারন করে কে এসেছেন। তবে যে তাকে দেখল এক অদ্ভুত পুলকে তার সারা শরীর মন শিহরিত হতে লাগল। দরিদ্রের কুটিরে নেমে এলো চাঁদের হাট। শাস্ত্রজ্ঞ ক্ষুদিরাম জন্ম লগ্ন মিলিয়ে দেখলেন এই দুর্লভ দেব শিশু ধর্ম স্থাপনের এক মহান ব্রত নিয়ে অক্ষন্ডের ঘর থেকে নেমে এসেছেন সীমার জগতে। কামারপুকুরের নয়নাভিরাম প্রকৃতির কোলে খেলতে খেলতে বড় হতে লাগল সেই দেব শিশু।তারপর কত ঘটনার সাক্ষী থাকল এই ছোট্ট গ্রামটির মাটি তা বলে শেষ করার নয়। মায়ের কোলে ছোট্ট গদাই যেন যশোদার কোলে গোপাল। হয়তো ‘ যুগে যুগে হরি নরদেহ ধরি’ এভাবেই আসেন মানুষের কাছে নিজেকে ধরা দিতে।
