টলিপাড়ার (Tollywood) চেনা রাজনৈতিক সমীকরণ যেন একের পর এক বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখ হিসেবে পরিচিত স্বরূপ বিশ্বাস (Swaroop Biswas) এবার পৌঁছে গেলেন আদালতের কাঠগড়ায়। তোলাবাজি (Extortion), হুমকি (Criminal Intimidation), শ্লীলতাহানি (Molestation) এবং অস্ত্র আইনের (Arms Act) একাধিক গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতারের পর শুক্রবার তাঁকে আলিপুর আদালতে (Alipore Court) পেশ করে পুলিশ।
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দুর্নীতি (Corruption), সিন্ডিকেটরাজ (Syndicate Raj) এবং তোলাবাজির বিরুদ্ধে প্রশাসনের কড়া অবস্থানের মধ্যেই এই গ্রেফতারি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ অভিযুক্ত স্বরূপ বিশ্বাস শুধু একজন আঞ্চলিক নেতা নন, তিনি রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী (Former Minister) অরূপ বিশ্বাসের (Aroop Biswas) ভাই এবং দীর্ঘদিন ধরে নিউ আলিপুর (New Alipore) ও টালিগঞ্জ (Tollygunge) অঞ্চলের অত্যন্ত প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত।
পুলিশ সূত্রে খবর, নিউ আলিপুর ও টালিগঞ্জ এলাকার একাধিক নির্মাণ ব্যবসায়ী (Builders) এবং প্রোমোটারদের (Promoters) কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে তোলা আদায়ের অভিযোগ জমা পড়ছিল। অভিযোগ, এলাকায় নতুন আবাসন (Housing Project), বহুতল (High-rise Building) বা রিয়েল এস্টেট (Real Estate) প্রকল্প শুরু করতে গেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হতো। সেই দাবি পূরণ না হলে নির্মাণকাজে বাধা, হুমকি এবং চাপ সৃষ্টি করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, সম্প্রতি এক নির্মাণ সংস্থার পক্ষ থেকে কোটি টাকার তোলা দাবি এবং ভয় দেখানোর অভিযোগে একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়। এরপরই তদন্তে গতি আসে। বেশ কয়েকদিন ধরে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর বৃহস্পতিবার রাতে স্বরূপ বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। পরে তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে রাতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সিমরন পাল (Simran Pal) নামে এক অভিযোগকারীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নিউ আলিপুর থানায় (New Alipore Police Station) মামলা রুজু হয়। মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita – BNS) ২০২৩-এর একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র আইনের (Arms Act) ২৫ ও ২৭ ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তদন্তে আরও একটি বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও অভিযোগের সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে টালিগঞ্জ ও নিউ আলিপুর অঞ্চলে স্বরূপ বিশ্বাসের প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। স্থানীয় স্তরে তাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলে মনে করা হতো। ফলে তাঁর গ্রেফতারি শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়, বরং এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত পর্যবেক্ষকদের।
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের দাবি, এই গ্রেফতারি দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেটরাজ এবং তোলাবাজির সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। অন্যদিকে শাসক দলের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
পুলিশ ইতিমধ্যেই আদালতের কাছে স্বরূপ বিশ্বাসকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানিয়েছে। তদন্তকারীদের অনুমান, জেরার মাধ্যমে তোলাবাজি চক্র, আর্থিক লেনদেন এবং অভিযোগে উল্লিখিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
এখন নজর আলিপুর আদালতের পরবর্তী নির্দেশ এবং তদন্তের অগ্রগতির দিকে। কারণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই ক্ষেত্রেই এই মামলা আগামী দিনে আরও বড় চর্চার বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
