স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুণ্য প্রয়াণ দিবসে বিনম্র প্রণাম।সিংহের মতো মেরুদণ্ড আর হিমালয়ের মতো অবিচল চিত্ত নিয়ে যিনি বাংলার শিক্ষাজগৎকে ঔপনিবেশিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন, আজ তার প্রয়াণ তিথিতে জানাই শতকোটি প্রণাম।
আজ ২৫ মে। ১৯২৪ সালের আজকের এই দিনেই বিহারের পাটনায় অবসান ঘটেছিল এক মহাজীবনের। আজ শিক্ষাব্রতী, কলকাতা হাইকোর্টের প্রাজ্ঞ বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপকার স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। শতবর্ষ পেরিয়েও আজ বাংলার শিক্ষাদর্শে ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় তিনি সমানভাবে উজ্জ্বল।
১৯২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সগৌরবে অবসর নেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কর্মবীর মানুষের তো বিশ্রাম থাকে না। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শিক্ষার আলো ছড়ানোর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন তিনি। ১৯২৪ সালের ২৫ মে, মাত্র ৫৯ বছর বয়সে পাটনায় আকস্মিকভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই যুগপুরুষ। তাঁর প্রয়াণে থমকে গিয়েছিল গোটা বাংলা, শোকাচ্ছন্ন হয়েছিল সমগ্র ভারতবর্ষ।”যারা বলেন বিপ্লব শুধু অস্ত্রেই হয়, তারা স্যার আশুতোষকে দেখেননি। তিনি কলম, খাতা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোকে ব্যবহার করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শিক্ষার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।”
কেন আজ তার প্রয়াণ দিবসে তাকে স্মরণ করা জরুরি?
১৯০৪ সালের ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় আইন যখন ভারতীয়দের শিক্ষার পরিধি সীমিত করতে চেয়েছিল, তখন উপাচার্য হিসেবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দেশী ভাষা’ (বাংলা) এবং ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাস’ বিভাগ চালু করেন। নিজে ছিলেন আগাগোড়া ক্ষুরধার ছাত্র। ১৮৭৯ সালে এন্ট্রান্সে দ্বিতীয় স্থান, পরবর্তীতে গণিত ও পদার্থবিদ্যায় জোড়া এম.এ এবং মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি’ (P.R.S) লাভ করেন। জ্যামিতির ওপর তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক স্তরে সমাদৃত হয়েছিল।
১৮৬৪ সালের ২৯ জুন কলকাতার বৌবাজারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজীবন মাটির কাছাকাছি ছিলেন। হুগলির জিরাট-বলাগড় গ্রামের মাটির টান তিনি ভোলেননি। তাঁরই সুযোগ্য পুত্র ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরবর্তীকালে পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ভারতের রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বনাম নৈতিকতার লড়াই চলছে, তখন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ আমাদের সবচেয়ে বড় পাথেয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র হতে দেননি, কিন্তু সেখান থেকেই তৈরি করেছিলেন দেশের সেরা সব জাতীয়তাবাদী মনন। মৃত্যুঞ্জয়ী এই ‘বাংলার বাঘ’-এর প্রয়াণ দিবসে আমাদের একটাই অঙ্গীকার হোক—শিক্ষার আঙিনায় মুক্ত চিন্তা আর মাথা উঁচু করে বাঁচার যে পাঠ তিনি দিয়ে গেছেন, তা যেন আমরা ভুলে না যাই।
