কলকাতা (Kolkata) শহরের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল শুক্রবার। দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কলকাতার মেয়র (Mayor) পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim)। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সম্মতি নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। পদত্যাগের পর আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠক (Press Conference)-এ আবেগ, আক্ষেপ এবং আত্মসমালোচনার মিশেলে এক ভিন্ন মেজাজে ধরা দিলেন ববি হাকিম। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দেন, শুধুমাত্র পদে থাকার জন্য কোনও চেয়ার আঁকড়ে বসে থাকার মানুষ তিনি নন।
ফিরহাদের কথায়, “যখন মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষমতাই থাকে না, তখন শুধু পদ ধরে রাখার কোনও মানে হয় না। কলকাতার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে সেই চেয়ারে বসে থাকার নৈতিক অধিকারও থাকে না।” নিজের দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও স্মরণ করেন তিনি। বিশেষ করে কোভিড-১৯ (COVID-19) মহামারী এবং ঘূর্ণিঝড় আমফান (Cyclone Amphan)-এর ভয়াবহ সময়ের কথা তুলে ধরে বলেন, সেই কঠিন পরিস্থিতিতে কলকাতাকে সচল রাখা এবং নাগরিক পরিষেবা (Civic Services) বজায় রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “আমফানের ধ্বংসস্তূপ থেকে কলকাতাকে ঘুরে দাঁড় করানো সহজ ছিল না। কোভিডের সময়ও আমরা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সেই লড়াই আজও আমার জীবনের অন্যতম বড় অভিজ্ঞতা।”
কলকাতার নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য চালু হওয়া ‘টক-টু-মেয়র’ (Talk To Mayor) কর্মসূচির কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ফিরহাদ। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের সমস্যা সরাসরি শোনা এবং দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে বেআইনি নির্মাণ (Illegal Construction) এবং অবৈধ বহুতল (Illegal High-rise)-এর বিরুদ্ধে প্রশাসনের পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি বর্ষাকালে জল জমার সমস্যা কমাতে নিকাশি ব্যবস্থা (Drainage System) উন্নয়নের জন্য নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের উল্লেখ করেন।
তবে বিদায়ী বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে আসে তাঁর অসহায়তার সুর। ফিরহাদের কথায়, “একসময় যে দায়িত্ব বুক চিতিয়ে পালন করতাম, আজ সেই কাজ আর আগের মতো করতে পারছি না। মেয়রের চেয়ার শুধু একটি পদ নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, একটি মর্যাদা। সেই মর্যাদা ধরে রাখতে না পারলে সেখানে বসে থাকার কোনও অর্থ নেই।” বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘নিধিরাম সর্দার’-এর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, “ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দারের মতো অবস্থায় কাজ করা সম্ভব নয়।”
অনেক পরিকল্পনা এবং স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই সরে দাঁড়াতে হচ্ছে বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। তবে আগামী দিনে যারা কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation) পরিচালনা করবেন, তাদের জন্য শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেননি। একইসঙ্গে রাজ্যের নতুন প্রশাসনের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন কলকাতার সাধারণ মানুষের নাগরিক পরিষেবা এবং প্রশাসনিক সহায়তা যেন কোনওভাবেই ব্যাহত না হয়। ফিরহাদ হাকিমের এই বিদায় শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং কলকাতার রাজনৈতিক ও নাগরিক প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
