Syama Prasad Mukherjee : আজ ১২৫তম জন্মজয়ন্তী: দেশভাগ ও অখণ্ড ভারতের ইতিহাস চর্চায় আজও প্রাসঙ্গিক ড. শ্যামাপ্রসাদ

আধ্যাত্মিক ইতিহাস

আজ ৬ই জুলাই। ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রদীপ্ত নক্ষত্র, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী। ১৯০১ সালের এই দিনে কলকাতায় এক ঐতিহ্যবাহী ও উচ্চ শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। আজ তাঁর এই ঐতিহাসিক জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সমাজ সংস্কার নিয়ে নতুন করে বড়সড় আলোচনা শুরু হয়েছে।

ড. মুখোপাধ্যায়ের আদি পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের অন্তর্গত জিরাট গ্রামে। তাঁর প্রপিতামহ দিগসুই গ্রাম থেকে এসে জিরাটে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর পিতামহ গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৮৩৬ সালে এই জিরাট গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত হয়ে কলকাতার ভবানীপুরে স্থায়ী হন। এই বংশেরই মহান সন্তান স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ পিতার পাণ্ডিত্য ও তেজস্বিতা পূর্ণমাত্রায় লাভ করেছিলেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য (ভাইস চ্যান্সেলর) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁরই আমন্ত্রণে ১৯৩৭ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ সংগীত রচনা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘চলো যাই, চলো যাই’ গানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। পরবর্তীতে তাঁর অন্য একটি গান ‘শুভ কর্ম পথে ধর নির্ভয় গান’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ধশতবর্ষে মূল সংগীতের মর্যাদা পায়। শিক্ষার প্রসারে ড. মুখোপাধ্যায়ের দূরদর্শিতা আজও আধুনিক ভারতের শিক্ষানীতির পথপ্রদর্শক হিসেবে গণ্য করা হয়।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান ছিল আজকের ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাজ্যের সৃষ্টি। ১৯৪১ সাল থেকেই তিনি দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন। তবে পরবর্তীতে দেশভাগ যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন বাঙালি হিন্দুদের সুরক্ষায় তিনি অবিভক্ত বাংলা ভাগের দাবি তোলেন।

১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বাংলা বিধানসভায় ঐতিহাসিক ভোটাভুটির মাধ্যমে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পৃথক রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্ত সিলমোহর পায়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়ে স্বাধীন ভারতের মানচিত্রে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামক রাজ্যের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই কারণেই ২০শে জুন তারিখটি ইতিহাসে অনন্য স্থান দখল করে আছে।

ভারতরত্ন ড. শ্যামাপ্রসাদের সাথে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের গভীর আধ্যাত্মিক সখ্য ছিল। মহাপ্রয়াণের পূর্বে স্বামী প্রণবানন্দ বাঙালি হিন্দুদের আত্মিক ও সামাজিক দায়িত্ব ড. শ্যামাপ্রসাদের হাতে সঁপে দিয়ে যান। ১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসে কাশীতে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের দুর্গাপূজার উৎসব সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় স্বামীজি তাঁর শিষ্যদের ড. শ্যামাপ্রসাদকে সসম্মানে ডেকে আনার নির্দেশ দেন। মহা অষ্টমীর দিন সকালে সপরিবারে ড. মুখার্জি আশ্রমে এসে মায়ের চরণে অঞ্জলি দেন এবং স্বামীজির বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করেন। আচার্যদেব সেদিন জোর দিয়ে বলেছিলেন, “বাঙালি জাতির সামনে দাঁড়ানোর একটা লোক ঠিক করে দিয়ে গেলাম। আমাদের ভাব শ্যামাপ্রসাদই কিছুটা বুঝতে পেরেছে।”

ফজলুল হক মন্ত্রিসভার অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন (১১ ডিসেম্বর ১৯৪১ – ২০ নভেম্বর ১৯৪২) ড. মুখার্জি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চরম অর্থনৈতিক সংকটের দিনে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। নজরুলের অসুস্থতা ও আর্থিক অনটনে ফজলুল হক সাহেবের কাছ থেকে সাহায্য না পেয়ে ড. মুখার্জি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কবিকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন এবং তাঁর সপরিবারে মধুপুরে থাকার সমস্ত ব্যবস্থা করেন। ১৭ জুলাই ১৯৪২ সালে কবি নজরুল মধুপুর থেকে ড. শ্যামাপ্রসাদকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন:

“…এই coalition ministry-র একমাত্র আপনাকে আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি, আর কাউকে নয়। আমি জানি আমরাই এই ভারতের পূর্ণ স্বাধীন করব। সেদিন বাঙালিরা আপনাকে ও সুভাষবাবুকে সকলের আগে মনে পড়বে, আপনারাই হবেন এদেশের পতাকার নায়ক।”

— কাজী নজরুল ইসলাম

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় জওহরলাল নেহেরুর আমন্ত্রণে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ভারতের প্রথম সিন্ধ্রি সার কারখানা, চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ স্থাপন এবং ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) স্থাপনের মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত তাঁর মন্ত্রিত্বকালেই গৃহীত হয়েছিল। তবে ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের ওপর নির্মম অত্যাচার ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ ‘নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি’-র তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রদানকারী ৩৭০ নম্বর ধারার তীব্র বিরোধী ছিলেন ড. মুখোপাধ্যায়। “এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান, দুই নিশান—চলবে না” এই ঐতিহাসিক স্লোগান তুলে তিনি তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৫৩ সালের ১১ মে কোনো প্রকার পারমিট ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশ করার অপরাধে তাঁকে শেখ আবদুল্লার সরকার গ্রেপ্তার করে। সেখানে বন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৫৩ সালের ২৩শে জুন অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আগামীকাল তাঁর এই ১২৫তম জন্মজয়ন্তীতে সমগ্র জাতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে এই মহান দেশনায়ককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *