নিট পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতি রুখতে দেশজুড়ে সাময়িক নিষিদ্ধ ‘টেলিগ্রাম’ অ্যাপ, জারি কড়া নির্দেশিকা

দেশ সর্বশেষ খবর

আগামী ২১ জুনের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট ইউজি ২০২৬ (NEET UG 2026) পুন:পরীক্ষার আগে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং প্রশ্নফাঁস রুখতে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র সরকার। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র সুপারিশের ভিত্তিতে এবং কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যৌথ পর্যালোচনার পর দেশজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ ‘টেলিগ্রাম’ (Telegram)-এর ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
কেন এই আচমকা নিষেধাজ্ঞা?
গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষায় দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র থেকে ১০০-রও বেশি প্রশ্ন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার জেরে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
তদন্তে ও এনটিএ-র অভিযোগে দেখা গেছে, অপরাধীরা টেলিগ্রাম অ্যাপের ‘অ্যানোনিমিটি’ বা পরিচয় গোপন রাখার সুবিধার সুযোগ নিয়ে সহজেই পার পেয়ে যেত। এমনকি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর টেলিগ্রামের কিছু গোপন গ্রুপ ও চ্যানেলে মেসেজ এডিটিং ফিচারের অপব্যবহার করে পুরনো পোস্টের অ্যাটাচমেন্ট বদলে সেখানে নিটের প্রশ্নপত্র যুক্ত করা হতো। এরপর মূল টাইমস্ট্যাম্প অপরিবর্তিত রেখে সেগুলিকে পরীক্ষা শুরুর আগেই ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ভুয়া প্রচার করে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হতো।
শুধু তাই নয়, রি-নিট পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র দেওয়ার নামে বেশ কিছু টেলিগ্রাম চ্যানেল, গ্রুপ ও বট পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত দাবি করে প্রতারণা চালাচ্ছিল। এই সমস্ত জালিয়াতি রুখতেই এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকায় কী বলা হয়েছে?
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী:
আগামী ২২ জুন পর্যন্ত ভারতের কোনও নেটওয়ার্ক থেকেই টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার বা অ্যাক্সেস করা যাবে না। এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র পরীক্ষার সময়কাল এবং তার ঠিক পরবর্তী সময়ের জন্যই প্রযোজ্য।
প্রতারণা রুখতে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রামের ‘মেসেজ এডিট’ ফিচারও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৩ জুনের নিট পরীক্ষার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ও সতর্কতা
এনটিএ জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘ভারতীয় সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার’ (I4C)-এর সাহায্যে ইতিমধ্যেই নিটের নামে প্রতারণা চালানো একাধিক টেলিগ্রাম চ্যানেল ও বট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আহমেদাবাদ সাইবার ক্রাইম শাখা একটি আন্তঃরাজ্য প্রতারণা চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করেছে এবং বিহার পুলিশও পরীক্ষার্থীদের সতর্ক করে সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এনটিএ স্পষ্ট করেছে যে এবার পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র করতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, তাই সোশ্যাল মিডিয়ার কোনও ভুয়া খবরে যেন পরীক্ষার্থীরা বিশ্বাস না করেন।
হোয়াটসঅ্যাপ কেন ছাড় পেল?
টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ হলেও হোয়াটসঅ্যাপের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হোয়াটসঅ্যাপের এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের কারণে সেখানে নজরদারি চালানো কঠিন হলেও, এটি মেটা (Meta) কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত এবং এটি মূলত ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, টেলিগ্রামে বড় বড় পাবলিক চ্যানেল ও গ্রুপ তৈরি করে সহজেই লাখ লাখ মানুষের কাছে মুহূর্তের মধ্যে উপাদান ছড়িয়ে দেওয়া যায়, যা অপরাধীদের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে হোয়াটসঅ্যাপের ওপরও কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
পরীক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
হঠাৎ টেলিগ্রাম বন্ধ হওয়ায় যেসব পরীক্ষার্থীরা এই অ্যাপের মাধ্যমে পড়াশোনার সামগ্রী আদান-প্রদান করতেন, তারা সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়েছেন। এই অসুবিধার জন্য এনটিএ দুঃখপ্রকাশ করেছে। তবে সৎ ও যোগ্য পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বহু শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *