ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মহাপ্রয়াণে এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের আধুনিক রূপায়ণে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য, সেই যুগস্রষ্টা ব্যক্তিত্বকে আমরা চিরতরে হারিয়েছি। ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল (২৬ চৈত্র ১৩০০ বঙ্গাব্দ) মাত্র ৫৫ বছর বয়সে কলকাতায় এই মহান সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। শেষ জীবনে তিনি মারাত্মক বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) রোগে ভুগছিলেন। তাঁর এই প্রয়াণ সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
জন্ম ও বংশপরিচয় –
১৮৩৮ সালের ২৬ জুন (১০ আষাঢ় ১২৪৫ বঙ্গাব্দ) উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার নৈহাটির নিকটবর্তী কাঁঠালপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বঙ্কিমচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মকালে মেদিনীপুর জেলার ডেপুটি কালেক্টর পদে advisers বা উন্নীত হয়েছিলেন। যাদবচন্দ্র ও মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবীর তৃতীয় পুত্র ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর অন্য দুই সহোদর ভাই হলেন শ্যামাচরণ ও সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সমাজে সুপরিচিত ছিলেন।
অনন্য শিক্ষাজীবন ও মেধার স্বাক্ষর –
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রকৃত শিক্ষার সূচনা ঘটেছিল মেদিনীপুরের ইংরেজি স্কুলে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। পরবর্তীতে তিনি হুগলি কলেজ (বর্তমানে হুগলি মহসিন কলেজ) এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর বঙ্কিমচন্দ্রই ছিলেন প্রথম ব্যাচের অন্যতম শিক্ষার্থী, যিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে, তিনি এবং যদুনাথ বসু যৌথভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম স্নাতক (বি.এ.) ডিগ্রিধারী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের অধীনে প্রশাসনিক চাকরিতে যোগদান করেন। কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দীর্ঘকাল ‘ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট’ এবং ‘ডেপুটি কালেক্টর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যশোর, মেদিনীপুর, খুলনা, চব্বিশ পরগণা ও আলিপুরসহ বাংলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তিনি সরকারি দায়িত্ব অত্যন্ত সুনামের সাথে সামলেছেন। তাঁর এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ রাজ তাঁকে ১৮৯১ সালে ‘রায় বাহাদুর’ এবং ১৮৯৪ সালে ‘সি.আই.ই.’ (Companion of the Most Eminent Order of the Indian Empire) খেতাবে ভূষিত করে। তবে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলেও তাঁর মূল মনন পড়ে থাকত সাহিত্য সাধনায়।
ব্যক্তিগত ও বৈবাহিক জীবন –
ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৪৯ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রথম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৮৫৯ সালে তাঁর প্রথমা পত্নী পরলোকগমন করেন। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে তিনি রাজলক্ষ্মী দেবীর সাথে পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে পাশে ছিলেন।
সাহিত্যিক অবদান: বাংলা উপন্যাসের রূপকার
বঙ্কিমচন্দ্রকে বাংলা উপন্যাসের প্রকৃত জনক বলা হয়। তাঁর প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বাংলা কথাসাহিত্যের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। এছাড়া তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ‘বঙ্গদর্শন’ তৎকালীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যার তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি হাস্যরস ও তীক্ষ্ণ সামাজিক সমালোচনার জন্য ‘কমলাকান্ত’ ছদ্মনামটি বেছে নিয়েছিলেন।
তাঁর অমর সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘রাজসিংহ’, ‘দেবী চৌধুরানী’ এবং ‘আনন্দন্দমঠ’ অন্যতম। বিশেষ করে ১৮৮২ সালে রচিত ‘আনন্দন্দমঠ’ উপন্যাসের অন্তর্গত “বন্দে মাতরম” গানটি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে এক অভূতপূর্ব গতি প্রদান করেছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক ভারতের জাতীয় স্তোত্র (National Song) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সাহিত্যক্ষেত্রে এই অনন্য ও রাজকীয় রাজত্বের কারণে তিনি দেশবাসীর কাছে চিরকাল ‘সাহিত্য সম্রাট’ হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
