প্রযুক্তির জগতে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন আবিষ্কার। সেই ধারাবাহিকতায় গবেষকরা এমন এক অভিনব শক্তি উৎপাদনকারী ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে সক্ষম। এই নতুন হাইড্রোজেল-ভিত্তিক জেনারেটর ভবিষ্যতে স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ব্যান্ড, ইয়ারবাড কিংবা বিভিন্ন মেডিকেল সেন্সরকে আলাদা করে চার্জ না দিয়েই চালানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষত্ব হলো, ডিভাইসটি বারবার বাঁকানো বা টানলেও সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
বর্তমানে পরিধানযোগ্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো ব্যাটারি। ঘন ঘন চার্জ দেওয়ার ঝামেলা যেমন রয়েছে, তেমনই পুরনো ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাই গবেষকদের মতে, পরিবেশ থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে সক্ষম এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ব্যাটারির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমাতে পারে এবং ই-ওয়েস্টও হ্রাস করতে সাহায্য করবে।
এই নতুন জেনারেটরটি বাতাসে থাকা আর্দ্রতা শোষণ করে বিদ্যুৎ তৈরি করে। ফলে স্কিন প্যাচ, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী সেন্সর, ফেস মাস্ক বা অন্যান্য ছোট পরিধানযোগ্য ডিভাইস প্রচলিত ব্যাটারি ছাড়াই কাজ করতে পারবে। তবে এতদিনের প্রযুক্তিতে একটি বড় সমস্যা ছিল—হাইড্রোজেল ও ইলেকট্রোডের সংযোগ দীর্ঘদিন স্থায়ী হতো না। ব্যবহার চলাকালীন সংযোগ দুর্বল হয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যেত।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে বিজ্ঞানীরা বিশেষ ধরনের আঠালো হাইড্রোজেল তৈরি করেছেন, যেখানে জল ও গ্লিসারলের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর সেটিকে প্রসারণযোগ্য রুপোর ইলেকট্রোড এবং তরল ধাতুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। গ্লিসারল সংযোগস্থলকে আরও মজবুত করে, বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ কমায় এবং জেলকে শুকিয়ে যাওয়া বা জমে যাওয়া থেকেও রক্ষা করে। ফলে ডিভাইসটি ভাঁজ করা বা প্রসারিত হলেও বিদ্যুতের প্রবাহে তেমন কোনও বাধা সৃষ্টি হয় না।
গবেষণার পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাতাসে প্রায় ৮৫ শতাংশ আর্দ্রতা থাকলে এই জেনারেটর প্রায় ০.৯৪ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি একটানা প্রায় ২২০ ঘণ্টা, অর্থাৎ ৯ দিনেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার বার বাঁকানো ও প্রসারিত করার পরও এর কার্যক্ষমতা প্রায় একই রকম ছিল।
গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা, ক্রীড়া পর্যবেক্ষণ, প্রবীণদের স্বাস্থ্য নজরদারি এবং দূরবর্তী অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পরীক্ষায় এটি শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণকারী সেন্সর ও ইসিজি ডিভাইস সফলভাবে চালিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন নিয়ে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
