সুরের আকাশে অম্লান নক্ষত্র: সঙ্গীত সম্রাট হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

সর্বশেষ খবর

বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুন বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান শিল্পী। কণ্ঠের জাদু এবং সুর সৃষ্টির অনন্য ক্ষমতায় তিনি দশকের পর দশক ধরে কোটি মানুষের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন। ১৯-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে গায়ক ও সুরকার হিসেবে নিজের অবস্থানকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। সহজ-সরল মেলোডি প্রধান গানই ছিল তাঁর সুরের মূল বৈশিষ্ট্য, যা বাঙালির সাঙ্গীতিক অন্তরে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটলেও সুরের আলোয় তিনি আজও জীবন্ত।
পারিবারিক পটভূমি
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরা ছিলেন তিন ভাই এবং এক বোন (নীলিমা). তাঁর বড় ভাই শক্তিদাস মুখোপাধ্যায় চাকরি করতেন, সেজো ভাই তারাজ্যোতি গল্প লিখতেন এবং ছোট ভাই অমল মুখোপাধ্যায় কিছু বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা ও কণ্ঠদান করেছিলেন. ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাংলা সঙ্গীত শিল্পী বেলা মুখোপাধ্যায়ের (মৃত্যু: ২৫ জুন ২০০৯) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন. তাঁদের দুই সন্তান—পুত্র জয়ন্ত এবং কন্যা রাণু। রাণু মুখোপাধ্যায় ১৯৬০-এর দশকের শেষে ও ৭০-এর দশকের শুরুতে গান গাইতেন এবং জয়ন্ত ১৯৭০-এর দশকে জনপ্রিয় ভারতীয় অভিনেত্রী মৌসুমী চোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
গণনাট্য সংঘ ও মুম্বই যাত্রা:
১৯৪০-এর দশকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) সক্রিয় সদস্য হন. সেখানে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক মেলবন্ধন ঘটে. ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে তাঁর গাওয়া অবাণিজ্যিক গান ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’ পূর্ব ভারতে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং তৎকালীন অন্যান্য পুরুষ গায়কদের থেকে তাঁকে অনেকটাই এগিয়ে দেয়।
এরপর ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক হেমেন গুপ্তের আহ্বানে তিনি মুম্বইয়ের (তৎকালীন বোম্বে) ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে যোগ দেন. সেখানে ১৯৫২ সালের ‘आनन्दमठ’ চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘বন্দে মাতরম’ গানে কুচকাওয়াজের সুরারোপ করে তিনি দারুণ সাড়া ফেলেন. বলিউডের নেপথ্য গায়ক হিসেবে দেব আনন্দ, প্রদীপ কুমার, সুনীল দত্ত এবং বিশ্বজিতের মতো তারকাদের জন্য অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দেন তিনি.
কর্মজীবনের সাফল্য ও ‘হেমন্ত-উত্তম’ জুটি:
১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘নাগিন’-এর সঙ্গীত পরিচালনা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়. এই ছবির গানগুলো টানা দুই বছর তালিকার শীর্ষে ছিল এবং ১৯৫৫ সালে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত নির্দেশনা পুরস্কার’ এনে দেয়. ঠিক একই বছর বাংলায় ‘শাপমোচন’ চলচ্চিত্রে অভিনেতা উত্তম কুমারের জন্য নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়ে শুরু হয় বিখ্যাত ‘হেমন্ত-উত্তম’ জুটির এক সোনালী অধ্যায়, যা পরবর্তী দশক জুড়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতকে শাসন করেছিল.
গায়ক হিসেবে তিনি নচিকেতা ঘোষ, রবিন চ্যাটার্জী, সলিল চৌধুরী প্রমুখের সুরে যেমন গেয়েছেন, তেমনই ‘হারানো সুর’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘লুকোচুরি’, ‘স্বরলিপি’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’ এবং হিন্দিতে ‘জাগৃতি’, ‘এক হি রাস্তার’ মতো চলচ্চিত্রে কালজয়ী সুর সৃষ্টি করেছেন.
চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও নিরীক্ষা
১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে তিনি ‘হেমন্ত-বেলা প্রোডাকশন’ নামে চলচ্চিত্র প্রযোজনা শুরু করেন. এই ব্যানারে মৃণাল সেনের পরিচালনায় ‘নীল আকাশের নীচে’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রটি ভারতের রাষ্ট্রপতির স্বর্ণ পদক লাভ করে. পরবর্তীতে এই কোম্পানির নাম বদলে ‘গীতাঞ্জলি প্রোডাকশন’ রাখা হয় এবং ‘বিশ সাল বাদ’, ‘কোহরা’, ‘খামোশি’র মতো সফল হিন্দি ছবি প্রযোজিত হয়.
১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ‘পলাতক’ চলচ্চিত্রে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে বাংলা লোকসঙ্গীত ও লঘু সঙ্গীতের সংমিশ্রণ ঘটান. রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিনাট্যগুলোতে তিনি ছিলেন প্রধান পুরুষ কণ্ঠ. দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্রের মতো কিংবদন্তিদের সাথে তাঁর রবীন্দ্র গ্রথনার বহুশ্রুত প্রদর্শন আজও স্মরণীয়.

সঙ্গীত জগতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন:
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: ১৯৭১ সালে ‘নিমন্ত্রক’ এবং ১৯৮৬ সালে ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ মেল প্লেব্যাক সিঙ্গারের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন.
বিএফজেএ (BFJA) পুরস্কার: সুরকার হিসেবে ‘স্বরলিপি’ (১৯৬২), ‘বিশ সাল বাদ’ (১৯৬৩), ‘পলাতক’ (১৯৬৪), ‘মনিহার’ (১৯৬৭), ‘বালিকা বধূ’ (১৯৬৮), ‘ফুলেশ্বরী’ (১৯৭৫), ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ (১৯৮৬), ‘পথভোলা’ (১৯৮৭) এবং ‘আগমন’ (১৯৮৮) চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পান. পাশাপাশি ‘ধন্যি মেয়ে’ (১৯৭২), ‘ফুলেশ্বরী’ (১৯৭৫) এবং ‘প্রিয় বান্ধবী’ (১৯৭৬) ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পুরুষ নেপথ্য গায়কের পুরস্কার পান।

আন্তর্জাতিক সম্মান: ১৯৭১ সালে প্রথম ভারতীয় গায়ক হিসেবে হলিউডের সিনেমায় নেপথ্য কণ্ঠ দান করেন এবং আমেরিকা সরকার কর্তৃক বাল্টিমোরের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা মৈত্রী পুরস্কার’ প্রদান করে।
১৯৮৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ‘ডি.লিট’, ১৯৮৬ সালে ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার’ এবং ‘মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার’ লাভ করেন. ১৯৮৫ সালে ‘বৈজ্ঞানিক’-এর তরফে তাঁকে ‘সঙ্গীতাচার্য’ উপাধিও দেওয়া হয়. (উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে পদ্মশ্রী এবং ১৯৮৭ সালে পদ্মভূষণ সম্মাননা দেওয়া হলেও তিনি তা অস্বীকৃতি জানান).
অমর উত্তরাধিকার
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রায় দেড়শটি বাংলা ছবিতে সুর দিয়েছেন এবং গান গেয়েছেন. তাঁর প্রথম রেকর্ড করা গান ছিল ১৯৩৭ সালের ‘জানিতে যদি গো তুমি’. এরপর ‘রানার ছুটেছে’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’র মতো শত শত কালজয়ী বাংলা গান ও রবীন্দ্রসঙ্গীত তিনি উপহার দিয়েছেন।তাঁর প্রয়াণের দুই দশক পরেও গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া প্রতি বছর তাঁর অ্যালবাম প্রকাশ করে চলেছে. নতুন প্রজন্মের অসংখ্য গায়ক আজও তাঁর গায়কী শৈলী অনুসরণ করে চলেছেন, যা প্রমাণ করে—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরের উত্তরাধিকার আজও সমান জীবন্ত ও অম্লান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *